সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

লবিং ও তদবিরে কি সবকিছুর সমাধান মেলে

পত্রিকার পাতায় খবর পড়লাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিদেশে লবিস্ট নিয়োগকারীদের দেশের কথা চিন্তা করার অনুরোধ জানিয়েছেন । গত সোমবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় তিনি বিদেশি লবিস্ট নিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে দেশটাকে ধ্বংস করবেন না।’ সরকার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখার জন্য যেসব লবিস্ট নিয়োগ করেছিল, তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি  জানিয়েছেন। লবিং বিতর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ভালো হতো পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি ব্যক্তি, দল ও সরকারের পক্ষে কোন লবিস্ট, কতদিন, কত অর্থের বিনিময়ে কী কাজ করেছেন, তার বিবরণ প্রকাশ করতেন। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেতে তৃতীয় দেশের সহায়তা চাওয়ার যেসব খবর বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা অবশ্য তাঁর বক্তব্যে মেলেনি।  

সরকার যদি লবিস্টদের চুক্তি সত্যিই বাতিল করে থাকে, তাহলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। কেননা, যেসব কাজের জন্য সরকার গোটা পাঁচেক লবিস্ট প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে যেসব কাজ করিয়েছে, তাতে তেমন কোনো ফল মেলে নি। সেগুলোতে দেশের কোনা লাভ তো দূরের কথা বরং অর্থের অপচয় হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে তা দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে বললেও ভুল হবে না। অর্থ অপচয়ের একটি নমুনা হচ্ছে বিজিআর গর্ভণমেন্ট অ্যাফেয়ার্স এলএলসিকে দিয়ে সরকারের উন্নয়ন প্রচারের কাজ করানো, যাদের ইমেইল প্রাপকদের তালিকায় ঢাকায় কাজ করেন এমন সাংবাদিকেরাও আছেন। বিদেশি সংবাদমাধ্যমে বিরোধীদলসহ সমালোচকদের কোনো বক্তব্য ছাপা হলে তার জবাবে অতীতের সরকারগুলোর ব্যর্থতার ফিরিস্তিসহ জবাব পাঠানোই এসব লবিং প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে হয়। 


আর, ফ্রিডল্যান্ডার কনসাল্টিং গ্রুপ এলএলসির পেশ করা বিবরণীতে দেখা যাচ্ছে, তারা পাঁচজন সিনেটরের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটা বৈঠকের জন্য চেষ্টা করার পাশাপাশি কয়েক শ কংগ্রেস সদস্যের কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ৫০তম বর্ষপূর্তি স্মরণে কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব যৌথভাবে উত্থাপনের জন্য লবিং করেছে। শেষ পর্যন্ত গত বছরের ২২ মে প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে বটে, তবে তা মাত্র দুজন সদস্য – ডেমোক্র্যাট ব্রায়ান হিগিন্স ও রিপাবলিকান আমাটা কোলম্যান রাদেওয়াগেন – যৌথভাবে তা উত্থাপন করেছিলেন। পরে প্রস্তাবটি পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এতে দেশের ভাবমূর্তি কতটা উজ্জ্বল হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীই তা ভালো বলতে পারবেন। লবিস্টদের সঙ্গে সরকারের চুক্তি আদৌ বাতিল হয়েছে কি না, তা জানতে আমাদের আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। লবিস্টরা বছরে তিন থেকে চারবার তাদের কাজ ও আয়ের বিবরণ প্রকাশ করে থাকেন এবং গত এপ্রিল পর্যন্ত যে বাতিল হয় নি, তা জুন মাসে হালনাগাদ করা ইলেক্ট্রনিক নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে। 


নির্বাচন ও  সরকারবিরোধী আন্দোলনের আওয়াজ উঠলেই লবিংয়ের কথা খুব জোরেশোরে আলোচনা হয়। বন্ধু রাষ্ট্র বা কোনো বিদেশি সংস্থা সুষ্ঠূ ও অবাধ নির্বাচন কিম্বা আন্দোলন মোকাবিলায় মৌলিক নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার কথা বললেই অভিযোগ ওঠে, বিরোধী দল বিদেশে লবিং করে দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। গত নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালে এরকম অভিযোগের পটভূমিতে অনুসন্ধান করে দেখা গেল লবিংয়ে কেউই কম যান না। 


যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন এজেন্টস রেজিষ্ট্রেশন অ্যাক্টের (ফারা) আওতায় সরকারের বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যভান্ডারে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং সরকারের লবিংয়ের কয়েক দশকের সব তথ্য সহজেই পাওয়া গেছে। তখন জামায়াতের পক্ষেও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে লবিংয়ের অনেক তথ্য পাওয়া গেল। তবে অর্থ খরচের দিক থেকে দেখা গেল, বিএনপি যা খরচ করেছে (তিন বছরে ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার), আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তার প্রায় আটগুণ খরচ করেছে (১২ লাখ ৬০ হাজার ডলার)। 


২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে বাংলাদেশের আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‍্যাব ও তার সাতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর সরকারের তরফে লবিং জোরদার করার সিদ্ধান্ত হয়। ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভায় যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, যদিও তখন একাধিক লবিস্ট সরকারের হয়ে কাজ করছিলো। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত  তথ্য অনুযায়ী তখনই সরকার বছরে অন্তত ৩ লাখ ২০ হাজার ডলার (পৌনে ৩ কোটি টাকা) করে খরচ করেছে। 


সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই আহ্বানের কয়েক দিন পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসদে বলেন, তিন বছরে বিএনপি দুই মিলিয়ন (২০ লাখ) মার্কিন ডলার (প্রায় ১৭ কোটি টাকা) খরচ করেছে। এরপর শোনা গেল বাংলাদেশ ব্যাংক বিএনপি কীভাবে ওই টাকা বিদেশে পাঠিয়েছে, তার তদন্ত করছে। বিএনপি তখন অভিযোগ অস্বীকার করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের  তদন্তেও কিছু পাওয়া গেল কি না, তা–ও আর জানা গেল না। 


বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, গত তিন বছরে বিএনপি বা অন্য কোনো বিরোধীদল যুক্তরাষ্ট্রে কোনো লবিং করেছে, এমন কোনো তথ্য যুক্তরাষ্ট্রে বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে নেই। সর্বশেষ যেটি পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে ব্লু স্টার স্ট্র্যাটেজিস এলএলসির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করার ঘোষণা। ব্লু স্টারকে যুক্তরাজ্যের আব্দুস সাত্তার নামের এক ব্যক্তি ২০১৮ সালের আগস্টে  বিএনপির জন্য লবিস্ট হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন। নির্বাচনের পর  নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন শীর্ষ রাজনীতিক ও কর্মকর্তার কাছে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সই করা চিঠি পাঠানোর তথ্য ব্লু স্টার স্ট্র্যাটেজিসের জমা দেওয়া বিবরণীতে পাওয়া যায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে তাদের চুক্তি বাতিলের পর থেকে বিএনপির লবিংয়ের কোনো তথ্য মেলে না। 


আরও বিস্ময়কর হচ্ছে সংসদ সদস্য  তাহজিব আলম সিদ্দিকীর লবিস্ট নিয়োগ। আইস মিলার এলএলপি নামের প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে গত বছরের মার্চ থেকে তিন বছরের জন্য তিনি একটি চুক্তি করেছেন। এজন্য তাঁর বছরে ১ লাখ ৬২ হাজার ডলার করে খরচ হবে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য লবিস্ট নিয়োগ করেছেন বলে চুক্তির বিবরণীতে দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁকে কী বাংলাদেশ ব্যাংক ওই পরিমাণে অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছে? তিনি একটি বেসরকারি বিদ্যূৎ উৎপাদন কেন্দ্রের স্বত্ত্বাধিকারী। কিন্তু সেটাই কি রাজনৈতিক কারণে  তাঁর বিদেশে অর্থ নেওয়ার উৎস? নাকি অন্য কোনো উৎস আছে?  পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বান কি তাঁর জন্যও প্রযোজ্য? 


লবিংয়ের এসব তথ্য পর্যালোচনায় দুটি বিষয় খুবই স্পষ্ট। প্রথমত, লবিং জোরদার করেও সরকার খুব একটা লাভবান হয় নি; বরং, এক নিষেধাজ্ঞার পিঠে আরেক ধরনের নিষেধাজ্ঞার হুমকি এসেছে। সুষ্ঠু ও অবাধ বা গণতান্ত্রিক নির্বাচন না হলে নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত অনেকের যুক্তরাষ্ট্রে আত্মীয়–স্বজনদের দেখতে যাওয়া, ছেলেমেয়েদের পড়ানো কিম্বা ব্যবসা–বাণিজ্যের সুযোগ খোঁজা বন্ধ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রে দৃশ্যমান  লবিং না করেও বিরোধীদল বিদেশিদের চাপের সুফল আপনাআপনি পাচ্ছে, সভা–সমাবেশ করতে পারছে, পুলিশী নির্যাতন কিছুটা কমেছে। 


লবিংয়ে অর্থ ব্যয় করে যে লাভ নেই – এ উপলব্ধি যদি সরকারের ভেতরে সত্যিই অনুভূত হয়, তাহলে তাকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসাবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু দেশে কার্যকর গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবন এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা ছাড়া গণতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন ও সহায়তা মিলবে না। সুষ্ঠূ নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হলে স্থিতিশীলতা নষ্টের অজুহাত তুলে হাতে গোণা মিত্রদের সমর্থনে ভরসা রাখা মূলত আরো গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার জন্ম দেবে। সুতরাং রাজনৈতিক সংকটের রাজনৈতিক সমাধানই খুঁজতে হবে। 


(২২ জুন, ২০২৩–এর প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত।)


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রোহিঙ্গাদের জন্য মানচিত্র বদলের প্রস্তাব!

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার স্বদেশে ফেরার বিষয়ে যেমনটি আশংকা করা হয়েছিল, তেমনটিই ঘটেছে। যত শিগগির সম্ভব তাদেরকে দেশে ফেরানোর কাজ শুরু হবে বলে মিয়ানমারের আশ্বাসে বিশ্বাস রাখা যে ভূল ছিল, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছেন। বাংলাদেশের কারণে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি বলে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেছেন যে দেশটি মিথ্যাচার করছে।  তাঁর পূর্বসুরি অবশ্য নীতিকৌশলে কোনো ভুলের কথা মানতে রাজি ছিলেন বলে মনে হয় নি। বিশেষত; আর্ন্তজাতিক ফোরামে সমস্যাটির সমাধানের কৌশল অনুসরণের দাবি উঠলেও চীন এবং ভারতের উৎসাহে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সমাধান সন্ধানেই তিনি আস্থা রেখেছিলেন। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গত প্রায় দু ‘ বছরে বহু কথা লেখা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। কিন্তু, এই জটিল সংকট এখন আরও জটিলতার দিকে যাচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নটি বিবেচনা জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুন যে জটিলতার আশংকা দেখা যাচ্ছে তার ইঙ্গিত মেলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশি...

Concern for Kajol during the pandemic

Does anyone know what had happened to Utpal Das? If you cannot remember who Utpal is, no one would blame you. Because, he is not a celebrity like all those familiar faces on our TV screens. Utpal, however, was in the news for quite some time in 2017, following his abduction and eventual return after two and a half months from confinement by his abductors. Before his abduction, Utpal was working as a journalist at a little-known online news portal called Purbapashchimbd.news. Till today, neither Utpal nor the law enforcing agencies have told us where he was for such a long period and who were behind his mysterious disappearance. There's a popular perception in society that those involved with the media are well looked after by the media. So, it was expected that the media fraternity would investigate this case and reveal the truth. Unfortunately, it didn't happen. Utpal's silence is akin to that of all other survivors of alleged enforce disappearances in the last decade ...

Central bank shake-up: Why is BNP undermining its reformist legacy?

The  removal of Bangladesh Bank  Governor Ahsan H Mansur, widely credited with steadying an economy that was on the brink of potential collapse, has been described by many as nothing short of a blunder by the new government. Of course, any government has the legal authority to appoint or remove a governor in pursuit of its economic agenda. Yet two aspects of this episode have shocked observers. First, the manner of Mansur’s departure, marked by public humiliation rather than a well-earned vote of thanks. Second, the appointment of a businessman burdened by apparent conflicts of interest and lacking expertise in banking and macroeconomic management. This mishandling of central bank leadership by the Bangladesh Nationalist Party (BNP) government warrants close scrutiny. However, responsibility does not rest with the current administration alone. The immediate past interim government also bears some blame. A draft law granting operational autonomy to Bangladesh Bank remained with...