সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার সাহসের উৎস হোক

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় অদম্য লড়াইয়ের জন্য ফিলিপাইনের মারিয়া রেসা ও রাশিয়ার দিমিত্রি মুরাতভ নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার ঘোষণার সময়ে নোবেল কমিটির চেয়ারপারসন বেরিট রিস এন্ডারসেন বলেছেন, মারিয়া রেসা ও দিমিত্রি মুরাতভ ফিলিপাইন ও রাশিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তাঁদের সাহসী লড়াইয়ের জন্য শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন। তিনি বলেন, একইসঙ্গে তাঁরা প্রতিনিধিত্ব করছেন বিশ্বের ওইসব সাংবাদিকদের, যাঁরা এই আদর্শের পক্ষে লড়ছেন, যে বিশ্বে গণতন্ত্র এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমবর্ধমান প্রতিকুলতার মুখোমুখি হচ্ছে। এন্ডারসেনের বক্তব্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার লড়াইকে যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে,তা আমাদের জন্যও আনন্দের ও অনুপ্রেরণার। কেননা, আমরাও সেই লড়াইয়ের অংশীদার। 

নোবেল কমিটির পুরস্কারের ঘোষণায় বলা হয়েছে, `মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্র ও টেকসই শান্তির অন্যতম পূর্বশর্ত`। তারা আরও বলেছে ক্ষমতার অপব্যবহার,, মিথ্যা এবং যুদ্ধের প্রচারণার বিরুদ্ধে সুরক্ষা হচ্ছে মুক্ত, স্বাধীন এবং তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা। জনসাধারণের অবহিত থাকা নিশ্চিত করায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্যের স্বাধীনতার অপরিহার্যতার কথা উল্লেখ করে নোবেল কমিটি বলেছে, এগুলো গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। 


স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়াও এই পুরস্কার ঘোষণার সঙ্গে অবধারিতভাবে আরও কিছু বিষয়ের গুরুত্ব ধ্রা পড়ে। প্রথমত, পুরস্কার পাওয়া উভয় সাংবাদিকের দেশেই কর্তৃত্ববাদী শাসনে মানবাধিকার গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে। ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে কমিটি দেশটির প্রেসিডেন্ট দুতার্তের মাদকবিরোধী অভিযানে অস্বাভাবিক উচ্চ সংখ্যার মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে তাকে  `দেশটির নিজ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমতুল্য` অভিহিত করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় মারিয়া রেসার নির্ভয় লড়াইয়ের কথা বলেছে। জনবিতর্ক নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে এবং বিরোধীদের হেনস্থা করতে ভুয়া খবর ছড়াতে সরকার  কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়েছে, রেসা ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত অনুসন্ধানী অনলাইন পোর্টাল `র‍্যাপলার` সে তথ্য তুলে ধরেছে।   


একইভাবে রাশিয়ায় দিমিত্রি মুরাতভ তাঁর নভোয়া গাজিয়েতায় তুলে ধরেছেন দূর্নীতি, পুলিশী সহিংসতা, বেআইনী গ্রেপ্তার, নির্বাচনী জালিয়াতি এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে হয়রানি ও ভয় দেখাতে রুশ সেনাবাহিনীর ট্রল ফ্যাক্টরির কথা। এ জন্য পত্রিকাটিকে নানারকম হয়রানি,হুমকি ও সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে। সংবাদপত্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের ছয়জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে আছেন চেচনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে লেখার জন্য নিহত আনা পলিতকোভস্কজা। এতোসব সহিংসতা ও হুমকির মধ্যেও দিমিত্রি মুরাতভ তাঁর সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে দিয়েছেন। 


নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে এর আগে মাত্র ৮৬ বছর আগে আরেকজন সাংবাদিক এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেটিও ছিল নাৎসিবাদের উত্থানকালে। তবে ১৯৩৫ সালের পুরস্কারবিজয়ী জার্মান সাংবাদিক কার্ল ফন অসিয়েতস্কি সাংবাদিকতা ছাড়াও শান্তি আন্দোলনের সংগঠক ছিলেন। সাবেক সৈনিক অসিয়েতস্কি জার্মান শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। তিনি সাংবাদিকতাও বেছে নিয়েছিলেন শান্তির স্বপক্ষে কলম ধরার জন্য। সেই অর্থে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্ত সাংবাদিকতার লড়াইয়ের জন্য মারিয়া রেসা এবং দিমিত্রি মুরাতভের পুরস্কারই প্রথম এবং ব্যতিক্রম।  


সাংবাদিকদের বৈশ্বিক সংগঠনগুলো এই পুরস্কারে যে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত বোধ করছে, সন্দেহ নেই। ইন্টারন্যাশ্নাল প্রেস ইনিস্টিটিউট, আইপিআই বলেছে এ পুরস্কার সাংবাদিকতায় উৎসাহের উৎস। মারিয়া ও দিমিত্রি দুজনকেই এর আগে আইপিআই ফ্রি মিডিয়া পুরস্কারে পুরস্কৃত করেছিল। রিপোর্টাস স্যঁ ফ্রঁতিয়ে ( আরএসএফ) বলেছ্‌ ভুয়া খবর ও বিদ্বেষের প্রসারের কারণে গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যখন খর্ব হচ্ছে তখন যাঁরা সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে মুক্ত ও স্বাধীনভাবে নির্ভরযোগ্য খবর ও তথ্য প্রকাশ করে চলেছেন, এঁরা ওইসব সাংবাদিকের প্রতিনিধিত্ব করেন। নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) বলেছে, এমন সময়ে এই পুরস্কার এসেছে যখন সাংবাদিকরা নজিরবিহীন হামলার শিকার হচ্ছেন, ডিজিটাল  নজরদারি চলছে এবং সাংবাদিকতায় মানুষের আস্থা কমছে। সিপিজের প্রধান নির্বাহী জোয়েল সায়মন বলেন, দিমিত্রি ও মারিয়া সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও তা কেন দরকার, তার প্রতীক। তাঁরা ব্যক্তিগত হুমকির মুখেও অব্যাহতভাবে সেন্সরশিপ অমান্য  ও নিপীড়ণ উপেক্ষা করে গেছেন এবং অন্যরাও যাতে তা-ই করে সেজন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন।  

সাংবাদিক হত্যা এবং তার বিচারহীনতায় ফিলিপাইন এবং রাশিয়ার অবস্থান বিশ্বে অন্যান্য দেশগুলোর অনেক উপরে। ১৯৯২ সাল থেকে সংকলিত পরিসংখ্যান বলছে, ফিলিপাইনে এ সময়ে নিহত হয়েছেন ৮৭ জন সাংবাদিক, আর রাশিয়ায় ৫৮ জন। এসময়ে সারা বিশ্বে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা ১৪১৬ জন। সিপিজের হিসাবে বাংলাদেশে এই একই সময়ে নিহত হয়েছেন ২৩ জন সাংবাদিক। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সূচকে আমাদের অবস্থান অবশ্য ফিলিপাইন এবং রাশিয়ারও নীচে। ১৮০টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১৫২, রাশিয়া ১৫০ এবং ফিলিপাইন ১৩৮। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মান নির্ধারণ করে যে সব প্রতিষ্ঠান, তাদের বিচারে আমাদের অবস্থান যে মোটেও সুখকর নয়, তা স্মরণ করা শুধু মর্মবেদনারই কারণ হবে।       


২০১৮ সালে টাইম সাময়িকী পারসন অব দ্য ইয়ার হিসেবে সত্যের লড়াইয়ে অভিভাবক (গার্ডিয়ান) হিসেবে কয়েকজন সাংবাদিকের কথা তুলে ধরেছিল। নিহত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি, ফিলিপাইনের মারিয়া রেসা, মিয়ানমারের ওয়া লান ও কো সোয়ে উ-র সঙ্গে বাংলাদেশের আলোকচিত্র সাংবাদিক  শহিদুল আলমও ছিলেন। শহিদুল আলমের মতো নিগ্রহ, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরও অনেকে। সাময়িক গুম, বিনাবিচারে বন্দিত্ব, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হয়রানি - এগুলো বেড়েই চলেছে। কম-বেশি চেষ্টাও আছে অদৃশ্য ও অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণ অমান্য করার, হুমকি-হয়রানির ভয় উপেক্ষার। কিন্তু, তার প্রভাব ততটা জোরালো নয়। 


রেসা ও মুরাতভ যৌথভাবে শান্তি পুরস্কার পেলেন। কারণ, তাঁরা সম্পাদক হিসাবে সবধরণের নিয়ন্ত্রণের (সেন্সরের) বেড়া অব্যাহতভাবে অমান্য করে গেছেন। তাঁরা যে সাহসের স্বীকৃতি পেলেন, তা থেকে আমাদের সম্পাদকেরা ও বার্তাকক্ষগুলো কতটা অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত হয়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। 


(১০ অক্টোবর, ২০২১-`র প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত।) 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ঘৃণা চাষের উর্বর ভূমি ও রাজনৈতিক সংকট

  দেশে একের পর এক অস্থিরতা সৃষ্টির বেশ কয়েকটি ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এগুলোর কোনোটিই প্রত্যাশিত ছিল না। অনেকেই এগুলো নির্বাচন যাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুত সময়ে না হয়, তার জন্য পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টা হিসাবে বর্ণনা করেছেন। পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির পিছনে প্রধানত: দুটি শক্তিকে দায়ী করা হচ্ছে – একটি হচ্ছে পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের পলাতক নেতৃত্বের সাংগঠনিক উদ্যোগ; অপরটি হচ্ছে, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম) সুবাদে সমাজে প্রভাব বিস্তারে দক্ষতা অর্জনকারী কিছু প্রভাবক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। এসব প্লাটফর্ম বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।  আপনি যদি কাউকে অপদস্থ বা হেয় করতে চান, তাহলে তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান সম্ভবত:  সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো একটি প্লাটফর্ম – বাংলাদেশে এটি ফেসবুক এবং ইউটিউব। বৈশ্বিক পরিসরে অবশ্য এক্স (সাবেক টুইটার) এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে গণহত্যার শিকার সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোয় এই সোশ্যাল মিডিয়া কী ভূমিকা রেখেছে, তা জাতিসংঘ তদন্...

ভারতে ’বাংলাদেশি ভাষা’ বিতর্ক, পুশ–ইন ও প্রতিক্রিয়া

  দিল্লি পুলিশ একটি চিঠিতে বাংলা ভাষাকে 'বাংলাদেশি ভাষা' হিসেবে উল্লেখ করায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায় 'বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলা কলঙ্কজনক, অপমানকর, দেশবিরোধী এবং অসাংবিধানিক কাজ। এটি ভারতের সব বাংলাভাষী মানুষকে অপমান করে। তারা আমাদেরকে হেয় করে (চিঠিতে) এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারে না।'  দিল্লির পুলিশ যে চিঠিতে বাংলাকে বাংলাদেশি ভাষা বলেছে, সেটি বাংলাভাষী কয়েকজনকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে একটি এফআইআর তদন্তের নথি অনুবাদ সম্পর্কিত। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের দিল্লিতে যে পান্থশালা আছে, সেখানকার কর্মকর্তাদের সাহায্য চাইতেই ওই চিঠি। চিঠিটি জুলাইয়ের ২৯ তারিখের। কিন্তু তার মাসখানেকের আগে থেকে মমতা বন্দোপাধ্যায় বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশি তকমা দিয়ে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন।  দিল্লিতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার পশ্চিম বঙ্গ ও আসামের রাজ্য বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সংখ্যালঘু মুসলমান বাংলাভাষীদের অবৈধ অভিবাসী হিসাবে চিহ্নিত করে যে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার কাজ শুরু কর...

নির্বাচনী আচরণবিধিতে এআই নিয়ে কথা নেই কেন

  গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন ’সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫’–এর খসড়া প্রকাশ করে আগামী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে এ বিষয়ে নাগরিকদের মতামত আহ্বান করেছে। নির্বাচনের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই আচরণবিধি, যা প্রতিযোগিতার মাঠকে সবার জন্য সমান করতে প্রয়োজন।  আচরণবিধিতে খুব বেশি নতুনত্ব নেই, যদিও কিছু পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপের ওপর বাড়তি গুরুত্ব নজরে পড়ে। নির্বাচনী প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ব্যবহারের প্রসঙ্গ শেষমুহূর্তের সংযোজন না হলেও খুব সুচিন্তিত নয়।  সবচেয়ে বিস্ময়ের কথা, এই আচরণবিধিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট করে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় নি। কিংবা কমিশনের তরফ থেকে কী ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তার কোনো ধারণা মেলে না।  অথচ বিশ্বের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে এআইয়ের অপব্যবহার বিপজ্জনক রুপ নিয়েছে। আচরণবিধির অন্যান্য বিষয়ে কিছু বলার আগে তাই এআইয়ের সম্ভাব্য অপব্যবহারের ঝুঁকির কথাই বলা দরকার। ২. গত ২ জুন নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার আর্ন্তজাতিক সংস্করণে ইতোমধ্যেই ৫০ টি দেশের নির্বাচনে এআই কী ধরণের হুমকি তৈরি করেছিল, তার উল্লেখ করে একটি বিশদ প্...